চোদ্দ বছর আগে ঘটে যাওয়া নন্দীগ্রাম গণহত্যায় অধিকারী পরিবারের ভূমিকা সম্পর্কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্য অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শুরু হয়েছে অনেক জল্পনা কল্পনা।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও দলনেত্রী হিসেবে মমতা যদি শুরু থেকেই বা দীর্ঘদিন ধরেই এ ব্যাপারে অবহিত হয়ে থাকেন তাহলে এখন নির্বাচনে অধিকারী পরিবার দলবদল করে বিজেপিতে চলে গেল বলেই মমতা কেন এই কথা প্রকাশ্যে বলছেন? এতদিন ‘ভদ্রতা’ দেখিয়েছি, ছেড়ে দিয়েছি, ‘ফেয়ার এনাফ’, ইত্যাদি বলে অবশ্যই মমতা আজ দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না।

কিন্তু মমতা ও অধিকারীদের মধ্যে যাই অভিযোগ আদানপ্রদান হোক তাতে কিছু বুনিয়াদী সত্য বদলে যাবে না।

নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনাটা ছিল ঘোষিত সত্য। তার বিরুদ্ধে ব্যাপক মানুষের বিক্ষোভ, আন্দোলন, জাগরণটা ছিল খাঁটি। নন্দীগ্রাম গণহত্যা ছিল একটা নির্মম বাস্তব। আর মনে রাখতে হবে, নন্দীগ্রামের ঠিক আগে সিঙ্গুর ঘটে গিয়েছিল। সেখানে পুলিশী নিপীড়ন সহযোগে জোর করে জমি নেওয়া হয়েছিল। আর এই সিঙ্গুরের সূত্র ধরেই নন্দীগ্রাম হয়ে উঠেছিল নন্দীগ্রাম।

নন্দীগ্রামে প্রয়াত কমরেড শংকর মিত্র, বিপ্রদাস চ্যাটার্জি এবং বর্তমানে আমাদের রাজ্য কমিটির সদস্য আইনজীবী দিবাকর ভট্টাচার্য ও ছাত্রনেতা মলয় তেওয়ারিরা যখন তথ্য অনুসন্ধানে গিয়েছিলেন তখন তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সিঙ্গুরে আমাদের রাজ্য নেতা তপন বটব্যাল স্থানীয় কৃষকদের সাথে পুলিশের হাতে নির্যাতিত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সাধারণ মানুষের সাথে কী হয়েছিল এবং সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া কী ছিল আমরা জানি। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে মানুষ এমনি বিক্ষোভে ফেটে পড়ে নি।

এই বিক্ষোভ শুধু সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, পশ্চিমবঙ্গ দেখে নি, কর্পোরেটের হাতে শিল্প, উন্নয়ন বা শহরের সৌন্দর্যকরণের নামে মানুষকে উচ্ছেদ করে জমি তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে জমি ও জীবিকা বাঁচানোর তীব্র আন্দোলন তখন গোটা দেশ জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছিল। এই আন্দোলনের ফলশ্রুতিতেই ১৮৯৪ এর ঔপনিবেশিক জমি অধিগ্রহণ আইন বাতিল হয়। ২০১৩ সালের নতুন আইনে জমি ও জীবিকারক্ষার প্রশ্নে মানুষ কিছু আইনী রক্ষাকবচের অধিকার পায়। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসেই নরেন্দ্র মোদী এই আইন সংশোধন করতে গেলে বিরাট বিরোধিতা ও বিক্ষোভের ফলে মোদী সরকারকে পিছু হটতে হয়।

অধিকারী পরিবার সম্পর্কে মমতার অভিযোগে সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের শক্তিশালী গণ আন্দোলন নাকচ হয়ে যায় না। একথা ঠিক যে সেই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ফসল মমতা ও তাঁর দলের ঘরে উঠেছিল। কিন্তু সে কারণে এই আন্দোলনকে সরকার বিরোধী রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করা যায় না। ঠিক যেমন আজকের কৃষক আন্দোলনকে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দেগে দেওয়া যাবে না।

~ দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
সাধারন সম্পাদক, CPIML লিবারেশন

Leave a Reply

Your email address will not be published.